বিজয়ের উল্লাস থেকে বিভীষিকা-দুই বছরেও শনাক্ত হয়নি আগুনের নেপথ্যের দায়ীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বাঁকবদলের দিন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সেদিন বিকেলে যশোর শহরের রাস্তায় নেমে আসে ছাত্র-জনতা। বিজয়ের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে শহর। মিছিল, স্লোগান আর আনন্দে তখন মানুষের মনে ছিল পরিবর্তনের প্রত্যাশা। কিন্তু সেই উল্লাসের মধ্যেই ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। শহরের চিত্রা মোড়ে অবস্থিত হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে শুরু হয় ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে বহুতল ভবনজুড়ে। হোটেলের ভেতরে আটকা পড়ে প্রাণ হারান ২৪ জন। আহত হন আরও ২৩ জন। আজ সেই ঘটনার দুই বছর পূর্তি। দুই বছর পরও হোটেল জাবিরের আগুনে নিহতদের স্বজনদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-কীভাবে ঘটল এই হত্যাকাণ্ড, কারা আগুন দিয়েছিল, আর কেন এত দিনেও প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা গেল না ?
বিজয়ের মিছিল থেকে ভয়াবহতা :
৫ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যশোর শহরে বিজয় মিছিল বের করেন ছাত্র-জনতা। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই মিছিল থেকে একপর্যায়ে কিছু বিক্ষুব্ধ লোকজন চিত্রা মোড়ে অবস্থিত হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে প্রবেশ করেন। হোটেলটিতে প্রথমে ভাঙচুর ও লুটপাট শুরু হয়। পরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিকেল ৪টার দিকে দ্বিতীয় দফায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আগুন ধীরে ধীরে হোটেলের বিভিন্ন তলায় ছড়িয়ে পড়ে।
হোটেলের বেজমেন্ট দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভবনটিতে প্রবেশ করেছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। অনেকে কৌতূহলবশত ভবনের বিভিন্ন তলায় উঠে যান। পরে নিচের দিকে আগুন লাগার পর তাঁরা আর বের হতে পারেননি। দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় পুরো ভবন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ওপরের তলাগুলোতে আটকা পড়া অনেকের শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। কেউ কেউ আগুনে পুড়ে মারা যান। রাত সাড়ে ৯টার দিকে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে পরদিন মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে।
২৪ প্রাণের করুণ পরিণতি :
জাবির ট্র্যাজেডিতে নিহত ২৪ জনের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন তরুণ ও কিশোর। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চাঁচড়া রায়পাড়ার আব্দুল আজিজ চাঁন (১৬), শাখারীগাতীর সিফাত হোসেন (২২), কিসমত নওয়াপাড়ার সোহানুর রহমান হিসাব (২৬), বারান্দি মোল্লাপাড়ার হাফিজ উদ্দিন (৩০), বালিয়া ভেকুটিয়ার রোকনুজ্জামান রাকিব (২২), উপশহরের সৈয়দ মিথুন মোর্শেদ (২৭), পুরাতন কসবার ফয়সাল হোসেন (২৫), মুজিব সড়কের শাওনাত মেহতাব প্রিয় (১৮), কৃষ্ণবাটির মেহেদী হাসান (১৩), সামিউর রহমান সাদ (১৭), রুহান ইসলাম (১৭), তারেক রহমান (২৮), আলামিন বিশ্বাস (২০), আবিরার মাসমুন নীল (১০), ইউসুফ আলী (১৫), মেহেদী হাসান আলিফ (১৫), সাকিবুল হাসান মাহি (১৫), আব্দুল্লাহ ইবনে শহীদ (২৬), রাসেল রানা (২১), সাকি (১৮), রিয়াদ শেখ (১৮), খালিদ হাসান শান্ত (১৬) এবং ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক উতম ডিজোকো।
ভাইকে উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ গেল রিয়াদের :
হোটেল জাবিরে মানুষ আটকা পড়ার খবর পেয়ে চাঁচড়া রায়পাড়ার কবির শেখের দুই ছেলে হৃদয় শেখ ও রিয়াদ শেখ সেখানে ছুটে যান। হৃদয় শেখ আহত অবস্থায় বের হতে পারলেও তাঁর ছোট ভাই রিয়াদ শেখ (১৮) আর ফিরতে পারেননি। হৃদয় শেখের ভাষ্য অনুযায়ী, হোটেলের ভেতরে আটকে পড়াদের উদ্ধারে গিয়ে তাঁরা কয়েকজনকে বের করে আনেন। কিন্তু আকস্মিক বিস্ফোরণ ও আগুনে রিয়াদসহ আরও অনেকে আটকা পড়ে যান।
রিয়াদের পরিবারের কাছে সেই দিনটি তাই শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিন নয়; একই সঙ্গে প্রিয় সন্তান হারানোর দিন।
‘মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে ছেলেটা মারা গেল’ :
নিহত খালিদ হাসান শান্তর মা খাদিজা বেগমের কাছে ৫ আগস্টের স্মৃতি আরও বেদনাদায়ক। শান্ত ছিলেন তাঁর একমাত্র ছেলে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে অন্যদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
খাদিজা বেগম জানান, শান্ত কোথাও আড্ডা দিত না। মাদ্রাসা ও বাড়িই ছিল তাঁর চলাফেরার প্রধান জায়গা। জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় সে নিয়মিত মিছিলে যেত।
৫ আগস্ট বিকেলে টেলিভিশনে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর দেখেছিলেন খাদিজা বেগম। পরে হোটেল জাবিরে আগুনে মানুষ মারা যাওয়ার খবর শুনে তিনি ছেলেকে খুঁজতে বের হন। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর রাত ১০টার দিকে মর্গে ছেলের মরদেহ দেখতে পান। একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিন তাঁর পরিবারের জন্য পরিণত হয় আজীবন বয়ে বেড়ানোর শোকে।
আগুনের ঘটনায় উঠেছিল নানা প্রশ্ন :
জাবির ট্র্যাজেডির পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে হোটেলে কেন এত বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢুকেছিলেন? অগ্নিসংযোগের সময় কেন তাঁদের বের করে আনার ব্যবস্থা করা যায়নি ? কীভাবে একাধিক তলায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ল ? ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল? আর কারা পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়েছিল ? প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, কিছু বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি পেট্রোল ও দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে আগুন ধরিয়েছিলেন। কেউ কেউ হোটেলের বিভিন্ন তলায় গিয়ে অগ্নিসংযোগ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে হলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক তথ্য, অগ্নিকাণ্ডের উৎস, ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং প্রত্যেক নিহতের মৃত্যুর কারণ-সবকিছুই সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
১৫ দিন পর মামলা :
ঘটনার ১৫ দিন পর, ১৯ আগস্ট হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে ২৪ জনকে হত্যার অভিযোগে অজ্ঞাত ২০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। মামলাটি করেন শাহীন চাকলাদারের চাচাতো ভাই ও যশোর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান তৌহিদ চাকলাদার ফন্টু।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট বেলা ৩টার দিকে প্রায় ২০০ জন দুর্বৃত্ত গানপাউডার ও পেট্রোল নিয়ে হোটেলে প্রবেশ করে। তারা প্রথমে লুটপাট চালায়। পরে হোটেলের বিভিন্ন তলায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে ইন্দোনেশিয়ার এক নাগরিকসহ ২৪ জন মারা যান।
মামলায় হোটেলের ক্যাশ ভল্ট ভেঙে টাকা লুট, ফ্রিজ, টেলিভিশন, জেনারেটর, আসবাবসহ বিভিন্ন মালামাল লুটের অভিযোগও আনা হয়।
দুই বছরেও শনাক্ত হয়নি প্রকৃত আসামি :
ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল হোসেন।
তিনি জানিয়েছেন, ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনার সময়কার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে হোটেলের ভেতরে ঘটনাটি সংঘটিত হওয়ায় এখনো প্রকৃত আসামিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
